না’গঞ্জবাসী আজ স্মরণ করছে ৫ পুলিশ সুপারকে

0
21
না’গঞ্জবাসী আজ স্মরণ করছে ৫ পুলিশ সুপারকে

বিশেষ প্রতিবেদক : আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে নারায়ণগঞ্জবাসী স্মরণ করছে ৫ পুলিশ সুপারকে। তারা হলেন, মো: মোমিন উল্লাহ পাটোয়ারী, মো: হেলাল উদ্দিন বদরী, মো: ইব্রাহিম ফাতেমী, মো: শাহাবুদ্দিন খান ও ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন। নারায়ণগঞ্জে তাদের কর্মকাল আজও ভুলতে পারেনি নারায়ণগঞ্জের মানুষ। তারা ৫জনই বিদায় বেলা ব্যাপকভাবে সম্মানিত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে। এবং দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভাগীয় প্রমোশন পেয়েছেন। আসলেই ভালো কাজের মূল্যায়ন সব সময়।
এরমধ্যে মো: মোমিন উল্লাহ পাটোয়ারী দুই দফা নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৮৮ সালের ২৮ আগস্ট থেকে ১৯৮৯ সালের ৩১ জানুয়ারি এবং ১৯৮৯ সালের ২০ জুলাই থেকে ১৯৯১ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মো: হেলাল উদ্দিন বদরী ২০০৩ সালের ২ এপ্রিল থেকে ২০০৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত, মো: ইব্রাহিম ফাতেমী ২০০৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী থেকে ২০০৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত, মো: শাহাবুদ্দিন খান ২০০৫ সালের ২৫ জুন থেকে ২০০৬ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এবং ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন ২০১৪ সালের ১ মে থেকে ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু গত বছরের ২ ডিসেম্বর দেশের আলোচিত এসপি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ পুলিশ সুপার হিসেবে নারায়ণগঞ্জে যোগদান করেন। আতঙ্ক দেয়া দেয় ব্যবসায়ি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে। কারণ গাজীপুরে থাকাকালীন এসপি হারুনের কর্মকান্ড নারায়ণগঞ্জবাসী ভালো করেই জানতো। তবে এসপি হারুন বিভিন্ন সভায় ও অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নারায়ণগঞ্জবাসীকে আশ্বস্থ করার চেষ্টা করেন তিনি অপরাধীদের জন্য আতঙ্ক, সাধারণদের বন্ধু। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জবাসী জেনে যায় এটা তার উপরের কথা। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরেই তিনি সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের উপর চড়াও হন। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন পেশার মানুষকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে এসে গ্রেপ্তার অথবা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করতেন।
অঢেল অর্থ-বিত্তের মালিক বনে যাওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জে এতটাই ক্ষমতাধর ছিলেন মন্ত্রী-এমপিদেরও কোন পাত্তাই দিতেন না। রীতিমত কোন প্রঢৌকল ম্যান্টেন পর্যন্ত করেননি তিনি। এ নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও যেন কিছুই করার ছিল না তাদের।
এদিকে সাধারণ ব্যবসায়ি তো দুরের কথা জেলার প্রভাবশালী শীর্ষ ব্যবসায়িরাও রাও এসপি হারুনের রোষানল থেকে রেহাই পায়নি। নাজেহাল হয়েছেন অনেকে। লোক লজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগিদের অনেকেই মুখ খুলেননি। নিরবে এসপি হারুনের অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে গেছেন তারা। এছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও তাকে অর্থ দিয়ে এলাকায় থাকতে হয়েছে। দু:খ করে অনেকেই এ প্রতিবেদককে বলেছেন, নিজের দল ক্ষমতায়। অথচ এসপি হারুনকে মাসোহারা দিয়ে এলাকায় থাকতে হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, দাবীকৃত টাকা না দিলে নানাভাবে হয়রানীর হুমকি দেয়া হতো। ফলে আমরা নিরুপায় ছিলাম। কিন্তু সব কিছুর একটা শেষ আছে তা প্রমানিত হয়েছে তার বদলীর মধ্য দিয়ে।
অভিযোগ রয়েছে, গাজীপুর থাকতেই এসপি হারুন নারায়ণগঞ্জের অনেক ব্যবসায়ি ও রাজনৈতিক নেতার তালিকা করেন। এবং কার থেকে কিভাবে অর্থ আদায় করবেন তারও একটা ছক করেন। এবং নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পর শুরু হয় তার টাকা কামানোর মিশন। এই কাজে তিনি সবচেয়ে বিশ্বস্থ সহচর হিসেবে ব্যবহার করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে। তার নির্দেশে প্রতিরাতে ডিবির একাধিক টিম কালো গ্লাসের হাইয়েস গাড়ি নিয়ে নেমে পড়তো ‘শিকার’ ধরতে। গাড়িতে মজুদ থাকতো ইয়াবা, অস্ত্র ও বিভিন্ন মাদক দ্রব। সুযোগ বুঝে ওই সকল জিনিস দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়া হতো নিরপরাধ ব্যবসায়ি, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও ধনীর দুলারীদের। যদিও ৬ অক্টোবর এসপি হারুনের অপকর্মের অন্যতম সহযোগি ডিবির ওসি এনামুল হককে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয় পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এক আদেশে। এক পর্যায়ে এসপি হারুন নিজের অপকর্ম ঢাকার জন্য এনামুল হককে বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে বদলী করা হয়েছে বলে স্থানীয় মিডিয়ায় প্রচার করান। মজার বিষয় হলো-প্রকাশ্যে এসপি হারুন বলতেন এক আর করতেন আরেক। দিনের বেলা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে বলতেন, মাদক ব্যবসায়ি, ভুমিদস্যু, চাঁদাবাজ, গডফাদার, সন্ত্রাসী-মাস্তানদের রক্ষা নাই। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আর রাতের বেলা চিহ্নিত বড় বড় অপরাধীদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। যারা টাকা দিতে রাজি হয়নি তাদের মাদক দিয়ে গ্রেপ্তার করে মিডিয়ায় বাহাবা নিয়েছেন।
নানা ঘটনার পর গত ১ নভেম্বর রাতে আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও গুলশান ক্লাবের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের স্ত্রী-পুত্রকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর পরদিন শনিবার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসপি হারুন দাবি করেন, শওকত আজিজের গাড়ি থেকে ২৮টি গুলি, ১ হাজার ২০০ ইয়াবা বড়ি, ২৪ বোতল বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ, ৪৮ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে। ওই সময় গাড়িতে শওকতের স্ত্রী ফারাহ রাসেল ও সন্তান আনাব আজিজ ছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁদের আটক করা হয়েছিল। পরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এম এ হাসেম সহযোগিতা করবেন বলে মুচলেকা দেওয়ায় তাঁর স্ত্রী-পুত্রকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় শওকত আজিজ বলেন, চাঁদা নিয়ে হারুন অর রশীদের সঙ্গে তাঁর পুরোনো বিরোধ ছিল। সম্প্রতি তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নতুন একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছেন। সেখানেও হারুন বাগড়া দিচ্ছিলেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার তিনি তাঁর স্ত্রী-পুত্রকে একটি পার্টিতে নামিয়ে ঢাকা ক্লাবে আসেন। ক্লাব থেকে বেরিয়ে দেখেন তাঁর গাড়িটি নেই। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন গাড়ি আছে নারায়ণগঞ্জে। পরদিন রাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে এসপি হারুন একদল পুলিশ নিয়ে তাঁর গুলশানের বাসায় ঢুকে ভাঙচুর করেন। এরপর তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যান। এ বিষয়ে নিকটস্থ গুলশান থানাকে কিছু জানায়নি নারায়ণগঞ্জের পুলিশ। পরদিন তাঁর খোয়া যাওয়া গাড়িতে ইয়াবা, মদ ও গুলি উদ্ধারের ঘটনা সাজিয়ে তাঁর ও তাঁর গাড়িচালকের নামে মামলা করেন। গুলশানের বাসা থেকে স্ত্রী-সন্তানকে তুলে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও শওকত তাঁর ফেসবুকে শেয়ার করেন।
শওকত আজিজ বলেন, এসপি হারুনের চাঁদাবাজি নিয়ে ২০১৬ সালের ৫ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে তিনি একটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশনের আদেশে গাজীপুর থেকে প্যত্যাহারের পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ তাঁর কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। তার পক্ষে উপ-পরিদর্শক আজহারুল ইসলাম আম্বার ডেনিমের স্টোর ম্যানেজার ইয়াহিয়া বাবুকে ফোন করে টাকা দাবি করেন। এর আগেও গুলশান ক্লাবের লামডা হলে ও গুলশানের কাবাব ফ্যাক্টরি রেস্তোরাঁয় এসপি হারুন তাকে ডেকে নিয়ে ৫ কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঠিকানায় পাঠাতে বলেন। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আম্বার ডেনিমের ৪৫ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গাজীপুর থানায় ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানো হয়।
এদিকে শুক্রবার রাতের ঘটনায় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী মহলে তোলপাড় শুরু হয়। এবং বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যলয়ের নজরে আনা হয় ৩ নভেম্বর দুপুরে। এরপরই ওইদিন বিকালে এসপি হারুনকে নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলীর আদেশ আসে বলে সুত্র জানায়।
শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত ও আলোচিত এসপি হারুনকে মাত্র ১১ মাসের মাথায় ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে (ট্রেনিং রিজার্ভ) সংযুক্ত করা হয়। এ ঘটনায় স্বস্তি দেখা দেয় নারায়ণগঞ্জে।
বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) বিকালে জেলা পুলিশ লাইনে এসপি আনুষ্ঠানিক বিদায় জানায় জেলা পুলিশ প্রশাসন। এসময় বিদায়ী বক্তব্য রাখতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন প্রতাপশালী এই পুলিশ কর্মকর্তা। যদিও বেলা ১১টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মলন কক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন এসপি হারুনের বিরুদ্ধে শীঘ্রই তদন্ত শুরু হবে। এরআগে বুধবার রূপগঞ্জে ফায়ার সার্ভিসের একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে এসপি হারুনকে দেখে উষ্মা প্রকাশ করেন। এরপরই নারায়ণগঞ্জ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন এসপি হারুন। এবং তড়িগড়ি করে বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় জেলা পুলিশ লাইনে। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টায় অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারন করা হলেও রহস্যজনকভাবে সেই অনুষ্ঠান শুরু হয় বেলা দুইটার দিকে। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে নারায়গঞ্জ ছাড়েন এসপি হারুন। মাত্র ১১ মাস দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নেভেটিভ-পজেটিভ নানা ঘটনার জন্ম দেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক (ডিআইও-১) আবদুল মমিন বলেন, বিদায় অনুষ্ঠান শেষে রীতি অনুযায়ী তার গাড়ি পুলিশ কর্মকর্তারা টেনে পুলিশ লাইনসের বাইরে নিয়ে যান। এরপর তাকে প্রটোকল দিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোডের সাইনবোর্ড পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে জেলা পুলিশের অন্যান্য উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তিনি আরো বলেন, নতুনভাবে কেউ যোগদান না করা পর্যন্ত এখন নাারয়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের দায়িত্বে আছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here